প্রসঙ্গ মুসলিম এলাকায় সঙ্ঘশাখা

সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাতা একটা ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা ইঙ্গিত করেছিলেন – শহরে ৩% এবং গ্রামাঞ্চলে ২% স্বয়ংসেবক তৈরি করতে পারলেই সঙ্ঘ আদর্শে সম্পূর্ণ সমাজকে প্রভাবিত করা সম্ভব হবে। আজ সঙ্ঘ সমগ্ৰ হিন্দু সমাজের গন্ডি পেরিয়ে মুসলমানদের মধ্যেও সরাসরি সঙ্ঘের কাজ শুরু করতে চলেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সঙ্ঘের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত সঙ্ঘের অধিকারীরা নেবেন এটাই স্বাভাবিক। বাইরে থেকে সমালোচনা করা সমীচীন নয়। তবে কয়েকটা প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রথমত, সঙ্ঘের উদ্দেশ্য হিন্দু সমাজের মধ্যে একটা সংগঠন তৈরি করা নয়, বরং সমগ্র হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করা- এই নীতির বর্তমান ব্যাখ্যা কী হবে?

দ্বিতীয়ত, ভারতে বসবাসরত মুসলমানদের কি সঙ্ঘ হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত মনে করছে? এর জন্য শুধুমাত্র ডিএনএ এক হ‌ওয়াই কি যথেষ্ট? তাদের বর্তমান চিন্তন প্রক্রিয়া, দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন, কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিচার্য বিষয় নয়?

তৃতীয়ত, আরবি নাম, আরবি সংস্কৃতি, আব্রাহামিক অসহিষ্ণু দর্শনে আস্থা, দারুল ইসলামের লক্ষ্য, জেহাদ প্রতিটি মুসলমানের পবিত্র কর্তব্য বলে বিশ্বাস, গজবা-এ-হিন্দের স্বপ্ন, লাভ জেহাদ, ধর্মান্তরকরণের জন্য দাওয়াত, ব্লক ভোটের রাজনীতি – এই সমস্ত কিছু বজায় রেখেও কি ভারতে বসবাসরত মুসলমানেরা হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?

চতুর্থত, অসহিষ্ণু আব্রাহামিক দর্শনে অনাস্থা রাখলে, কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদকে অস্বীকার করলে, ভারতীয় পরিচয়কে মুসলিম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দিলেও কাউকে মুসলমান হয়ে থাকার অনুমতি কি ইসলাম আদৌ দেয়? অর্থাৎ, একজন ইমানদার মুসলমান কি এক‌ই সাথে হিন্দু হতে পারে?

আমার কাছে মুসলমানদের নিয়ে সঙ্ঘের এই আগ্রহের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়। একথা সত্য যে আমাদের সকলের ডিএনএ এক। ঠিক যেমনভাবে দেবতা এবং দৈত্যদের ডিএনএ এক। উভয়েই ঋষি কশ্যপের বংশধর। কিন্তু ডিএনএ এক হলেই সমাজ এক হয় না। গান্ধীজি এই ঐক্য নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন এবং তার ফলশ্রুতিও আমরা জানি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকা একান্ত আবশ্যক। ভারতের মুসলমানরা আসলে যে হিন্দু – এই উপলব্ধি মুসলমানদের যতদিন না হচ্ছে ততদিন আমরা এক হতে পারবো না। তাড়াহুড়ো না করে ওদের সময় দেওয়া হোক।

ফুরফুরার ইতিবৃত্ত

আজ থেকে প্রায় সাতশ বছর আগের ঘটনা। বঙ্গদেশের অধিকাংশ তখন মুসলিম শাসনাধীন। হুগলী জেলার বালিয়া বাসন্তী তখনও মুসলমানদের দাসত্ব স্বীকার করে নি। স্বাধীনচেতা বাগদীদের রাজত্ব সেখানে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। রাজার নাম সম্ভবতঃ চন্দ্রনাথ কিংবা গোবিন্দচন্দ্র। কিন্তু মুসলিম শাসকদের চোখে তখন বিশ্বজুড়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে পৃথিবীর সর্বত্র। তাই বালিয়া বাসন্তী কীভাবে কাফেরদের অধীনে থাকতে পারে! অতএব হজরত শাহ হোসেন বুখারীর নেতৃত্বে সেনা অভিযান শুরু হল বালিয়া বাসন্তী দখলের জন্য। এই সৈন্যদলের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন হজরত মওলানা মনসুর বাগদাদী।

বালিয়া বাসন্তী আক্রমণকারী এই বাগদাদী মহাশয় হলেন ফুরফুরা শরীফের প্রাণপুরুষ দাদা হুজুর নামে পরিচিত মহম্মদ আবু বকর সিদ্দিকীর পূর্বপুরুষ। আরও পিছনের দিকে গেলে দেখা যায় যে এই দাদা হুজুর হলেন নবী হজরত মহম্মদের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিকীর বংশধর। অর্থাৎ আজকের ত্বহা সিদ্দিকী এবং আব্বাস সিদ্দিকীরা হলেন বালিয়াবাসন্তী আক্রমণকারী বাগদাদীদের উত্তরসূরি।

এখন ওদের মুখ থেকেই শোনা যাক এই হানাদারেরা কিভাবে বালিয়াবাসন্তী দখল করেছিল-

প্রাতঃকালে মোসলেম সৈন্যগণ বাগ্দী রাজার অধীনস্থ গ্রামসমূহ আক্রমণ করেন। বাগদী রাজা বহু সৈন্যসহ তাঁহাদের সম্মুখীন হন। ইহার ফলে উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত হয়। ইহার ফলে বাগ্দী রাজার বহু সৈন্য হতাহত হয়। পরদিবস পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ হইল। কিন্তু বাগ্দী রাজার সৈন্য সংখ্যা মোসলেম সৈন্য সংখ্যার দ্বিগুণ দেখিয়া মোসলেম সৈন্যগণের মধ্যে শাহ সোলায়মান এবং অন্যান্য বহু বোজর্গ-সৈন্য শহীদ হইলেন। ইহাতে সেনাপতি বিষম চিন্তায় পতিত হইয়া অশ্রু বিসর্জ্জনপূর্ব্বক আল্লাহতায়ালার নিকট মোনাজাত করিতে লাগিলেন এবং ফতেহ হইবার নিমিত্ত দোয়া চাহিয়া নিদ্রাভিভূত হইলেন চিন্তিত সেনাপতি সৈয়দ হোসেন বুখারী (রহ.) নিদ্রিত অবস্থায় এক আশ্চর্য ও অভিনব স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন নিদ্রিত অবস্থায় তাঁহাকে স্বপ্নে যেন কেহ বলিতেছেন ঐ বাগ্দী রাজার বাড়ীতে জিঁয়ত কুন্ড-নামে এক পুষ্পরিণী আছে, তথায় দুষ্ট জেন প্রভৃতি বাস করে। আহত সৈন্যগণকে উহাতে নিক্ষেপ করিলে, উক্ত দুষ্ট জেনগণ উহাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া অসীম বলশালী করিয়া তোলে। এই নিমিত্ত উহার সৈন্যসংখ্যা হ্রাস পাইতেছে না। যদি কোনও উপায়ে উহাতে একখ- গরুর গোশত নিক্ষেপ করা যায়, তাহা হইলে উক্ত দুষ্ট জেন প্রভৃতি পলায়ন করিবে। সুতরাং উহাদের সমস্ত শক্তি বিনষ্ট হইয়া যাইবে। (ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস, হযরত মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিকী সাহেবের লিখিত ও প্রকাশিত, তৃতীয় সংস্করণ, প্রকাশকাল-আষাঢ়, ১৩৪৩ বাংলা, পৃঃ ৪-৫)।

উক্ত নিগুঢ়-রহস্য জানতে পেরে তিনি আল্লাহপাকের দরবারে শোকর গোজারী করতে লাগলেন এবং কি উপায়ে উক্ত কাজ সমাধা করা সম্ভব হয় সে বিষয়ে চিন্তা করতে থাকেন। এমন সময় খবর পেলেন যে, উক্ত রাজা মেহমানদেরঅত্যন্ত সমাদর করেন এবং আহারাদি না করিয়ে কোনরূপেই তাঁকে বিদায় দেন না।

এই সংবাদ প্রাপ্তে তিনি পুরোহিতের বেশ ধারণ করত জপমালা হস্তে লইলেন এবং একখ- গরুর গোশ্ত প্রচ্ছন্নভাবে লইয়া এক বৃক্ষতলে বসিয়া জপ আরম্ভ করিলেন। (কারণ হাদীসে আছে الحرب خدة) বাগ্দী রাজা উক্ত পুরোহিতের সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে দাসবৃন্দকে আদেশ করিল যে, তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করত উত্তমরূপে আহারাদি করাইয়া বিদায় দাও। দাসবৃন্দ নানা উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য লইয়া পুরোহিতের নিকট গমন করিলেন এবং আহার করিবার নিমিত্তে তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি তাহাদের প্রতি ভ্রক্ষেপও করিলেন না। দাসবৃন্দ বিফল মনোরথ হইয়া রাজার নিকট প্রত্যাবর্তন করিল। রাজা স্বয়ং তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া বিনয় পূর্বক তাঁহাকে রাজবাড়ি ভ্রমণ করিয়া আহারাদি সম্পন্ন করিতে সবিশেষ অনুরোধ করিলে, পুরোহিত বেশধারী হযরত শাহ হোসেন বোখারী (রহ.) উত্তরে জানাইলেন যে, আমি বহুদিন পর্যন্ত স্নান করি নাই এবং স্নান না করিয়া আহারাদি সম্পন্ন করিতে পারিব না। অদ্য জিঁয়ত কু- পুষ্করিণীতে স্নান করিয়া আহারাদি সম্পন্ন করিলে গোনাহ সমূহ মোচন হইবে। ইহা বিধাতার আদেশ। তন্নিমিত্ত এখানে উপস্থিত হইয়াছি।তদ্শ্রবণে বাগদী রাজা অতিশয় আনন্দিত হইল। তাঁহাকে জিঁয়তকুন্ডে পুষ্করিণী দেখাইয়া তথায় স্নান করিতে অনুরোধ করিলেন এবং অন্দর মহলে প্রবেশ করিলেন। তিনি এই সুযোগে আপন উদ্দেশ্য পূর্ণ করিলেন। গোশতখ- পুষ্করিণীতে নিক্ষিপ্ত হইবা মাত্র এরূপ ভয়াবহ শব্দ উত্থিত হইল যে, রাজবাড়ির সমস্ত মানুষ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পতিত হইল। ইত্যবসরে তিনি ঐ স্থান হইতে প্রস্থান করত নিজ শিবিরে উপস্থিত হইলেন। উল্লিখিত শব্দটি আর কিছ্ই নহে, জিঁয়ত-কুন্ডে যে সকল দুষ্ট জেন প্রভৃতি ছিল, তাহারা ঐরূপ বিকট শব্দ করিয়া ঐ স্থান হইতে প্রস্থান করিয়াছিল

পরদিন সকালে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হল। উভয়পক্ষের বহু সৈন্য হতাহত হল। বাগদী রাজা আহত সৈন্যগণকে পূর্বের ন্যায় জিয়ত কুন্ডে নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু ঐদিন একজন সৈন্যও ক্ষমতাসম্পন্ন হইল না, বরং পানিতে নিমজ্জিত হইয়া মরিয়া গেলঅতঃপর মুসলমান সৈন্যগণ সহজেই যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। বেগতিক দেখিয়া বাগ্দী রাজা অবশিষ্ট সৈন্যসহ বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর রাজার দেশের দিকে পলায়ন করিল (ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস, ৩য় সংষ্করণ, ১৩৪৩ বাংলা, পৃষ্ঠা ৫-৬)

এইভাবে প্রতারণা করে বালিয়াবাসন্তী রাজ্যে খিলাফত কায়েম করার পরে সেখানে ফুরফুরা শরীফ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই প্রসঙ্গে ‘ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকী(রহঃ) এর বিস্তারিত জীবনী’ গ্রন্থে গ্রন্থকার হজরত আল্লামা মহম্মদ রুহল আমিন(রহঃ) লিখেছেন – চারিজন মুসলমান সৈন্য পলায়নপর রাজ সৈন্যের দিকে ধাবিত হইলেন এবং কাগমারী মাঠে তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিয়া শহীদ হইয়া গেলেন। সেনাপতি এই সংবাদ শুনিয়া তাহাদের মৃতদেহ আনাইয়া বালিয়াবাসন্তীতে দফন করতঃ তদুপরি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করাইয়া দেন। তাহাদের মস্তক দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল বলিয়া উহা কাগমারী মাঠেই সমাহিত করা হইয়াছে। শত শত লোক এখনও চারি শহীদের মাজারে জিয়ারত করিয়া থাকে। বালিয়াবাসন্তীতে মুসলিম গৌরব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হইলে তথাকার নাম হজরতে ফুরফুরা শরীফ রাখা হয়। এর অর্থ এই যে ফুরফুরা শরীফ হল আরব সাম্রাজ্যবাদীদের বালিয়াবাসন্তী বিজয়ের গৌরবের প্রতীক। এখন অনেকেই এই বইয়ে যা লেখা আছে তার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। আমার কাছে এর ঐতিহাসিক সত্যতার থেকেও এই বইয়ের ভুমিকায় লেখকের একটি স্বীকারোক্তিকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে – পুস্তকের প্রত্যেকটি বিষয় পীর সাহেব কেবলার  সুযোগ্য সাহেবজাদাগণের অনুমতি ও অনুমোদন লইয়া প্রকাশিত (পৃষ্ঠাঃ ৪)।

এবারে আসুন ফুরফুরা শরীফের সাথে যার নাম বারবার উচ্চারিত হয় সেই দাদা হুজুর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকি ১৮৪৫ সালে ফুরফুরা শরীফে পিতা আব্দুল মুক্তাদির সিদ্দিকীর ঘরে জন্ম গ্ৰহণ করেন। ইনি ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকির সরাসরি বংশধর এবং সবার কাছে দাদা হুজুর পীর কেবলা নামে পরিচিত।

পশ্চিমবঙ্গগ, বাংলাদেশ, আসাম ও অন্য আরও অনেক স্থানে তাঁর খলিফাগণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তাদের মোট সংখ্যা ছিল ৫৭০ জন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১১০০ মাদরাসা এবং ৭০০ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ‘জমিয়তে উলেমা’ নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এবারে পীর সাহেবের চিন্তাধারা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাক।

খিলাফত আন্দোলন চলাকলীন একবার গান্ধীজী মওলানা সওকত আলি, মহম্মদ আলি প্রমুখ কয়েকজন মুসলমান সহ টিকাটুলি মসজিদে পীর সাহেবের সাথে দেখা করেন এবং তাকে কংগ্রেসে যোগদান করতে অনুরোধ করেন। জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি কোরান-হাদিসের পক্ষপাতী। কংগ্রেস য়দি ভারতে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য এবং ইসলামের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয় তবে কংগ্রেসে যোগ দিতে তার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু কংগ্রেস এর মধ্যে কোনও একটির বিরোধিতা করলে আর তার কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পাবে না। পরে গান্ধীজীর অনুপস্থিতিতে পীর সাহেব মওলানা মহম্মদ আলীকে জানিয়ে দেন যে কংগ্রেসের উপরে তার আস্থা নেই। তিনি বলেন আমাদের কাছে আগে দ্বীন, পরে দেশ। দ্বীন ছেড়ে দিয়ে দেশের উদ্ধার আমাদের অভিপ্রেত নয়(ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকী-এর বিস্তারিত জীবনীঃ পৃষ্ঠা- ৫৮)।

১৯৩০ সালের ১লা এপ্রিল বৃটিশ ভারতে বাল্যবিবাহ নিরোধক আইন কার্যকর হয়। এই আইনকে সারদা আইনও বলা হত। পীর সাহেব বলেন এই আইন মুসলমানদের কোরান ও হাদীসের পরিপন্থী। কারণ কোরানে বাল্যবিবাহের অনুমোদন আছে। স্বয়ং নবী হজরত মহম্মদ নাবালিকা আয়েশাকে বিবাহ করেছিলেন। তাই এই সারদা আইনের প্রতিবাদে পীর সাহেব মনুমেন্টের নিচে একটি বিশাল জমায়েতের আয়োজন করেন এবং বলেন এই আইনের দ্বারা মুসলমানদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুসলমানদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে- জেহাদ অথবা হিজরত। শুধু সভা করেই তিনি ক্ষান্ত হন নি। তিনি নিজে এই আইন ভেঙে একজন নাবালিকার বিয়েও দেন।

পীর সাহেব সহি ইসলামি রীতিনীতির সাথে কোনও রকম আপোষ করতেন না। একবার উত্তরপাড়ায় একটি সভায় গিয়েছিলেন। সমবেত হিন্দু জনতা তাকে বন্দেমাতরম ধ্বনিতে স্বাগত জানালে তিনি গাড়ির উপর থেকে ‘চোপরও’ বলে হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন। জনতা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের পাশে হিন্দুদের একটি প্রস্তরমূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন এই পীর সাহেব। ফলস্বরূপ এই মূর্তি আর বসানো সম্ভব হয় নি।

কলকাতার টালায় একটি অস্থায়ী মসজিদ ছিল। সেখানে মুসলমানরা গরু জবাই করার চেষ্টা করলে স্থানীয় হিন্দুরা বাধা দেয় এবং মসজিদটির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের শরণাপন্ন হয়। মুসলমানরা তাড়াতাড়ি ওই মসজিদের বিল্ডিং পাকা করার কাজ শুরু করে। আদালত থেকে ইনজাংশন জারী হওয়ার পরেও জোর করে এই নির্মাণকাজ চলতে থাকলে অবশেষে সেনা নামানো হয়। এই পরিস্থিতিতে এই হজরত পীর সাহেবের নির্দেশে সুরাবর্দী এবং হাজী মুসা শেঠ এগিয়ে আসেন। মুসা শেঠের আর্থিক সহায়তায় এবং সুরাবর্দীর ইঙ্গিতে কয়েক হাজার মুসলমান জমায়েত হয়ে রাতারাতি পাকা মসজিদ তৈরি করে ফেলে।

পোড়াদহ নামের একটি জায়গায় জনৈক সুফি সুলেমানের বাড়িতে ইসালে সওয়াব অনুষ্ঠানে গরু কাটার পরিকল্পনা করা হয়। স্থানীয় হিন্দুরা বাধা দিলে এই হজরত পীর সাহেব নিজে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। ফলে কয়েক হাজার মুসলমান সেখানে জমায়েত হয়। এই ভীড় দেখে হিন্দুরা পিছিয়ে যায় এবং নির্বিঘ্নে সেখানে গরু জবাই করা হয়।

তিনি মুসলিম লীগের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আল্লাহ ও রসুলের আদেশে মুসলিম লীগ মুসলমানদের একতাসূত্রে আবদ্ধ করার কাজ করছিল বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। বহুবার কৃষক প্রজাপার্টি এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তিনি ফতোয়া জারী করেছিলেন।

বৃদ্ধাবস্থায় পীর সাহেব একটি অসিয়ত বা উইল করে গিয়েছিলেন। সেই অসিয়তে তার ভক্তদের জন্য কিছু নির্দেশাবলী তিনি লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তার মধ্য থেকে কয়েকটি নির্দেশের উল্লেখ এখানে করা দরকার-

১১) হিন্দুদের পূজা পার্বনে, মেলা, তেওহার, গান-বাজনার স্থানে সাহায্য করবেন না এবং সেখানে যাবেন না। পূজায় পাঁঠা, কলা, ইক্ষু, দুধ ইত্যাদি বিক্রয় করবেন না। ভেট দেবেন না, দিলে গুনাহ হবে।

৫১) কেউ শেরেক গুনাহ করবেন না। যেমন হিন্দুর পূজায় ভেট দেওয়া, পাঁঠা, কলা, দুধ বিক্রি করা….. কেউ ধান-চাউলকে মা লক্ষ্ণী বলবে না।

৫২) অমুসলমানদের তৈরি মিষ্টান্ন ইত্যাদি না খাওয়া ভাল। কারণ তাদের কাছে যা হালাল, আমাদের কাছে সেগুলো হারাম।

‘ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকী(রহঃ) এর বিস্তারিত জীবনী’ গ্রন্থে গ্রন্থকারের বর্ণনা অনুযায়ী হজরত পীর সাহেব পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মুসলমানরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। দেশের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় মুসলমানদের জন্য অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। মসজিদ অথবা কবরস্থান নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি ‘প্রধান সেনাপতি রূপে সাহায্য করিয়া মুসলমানদিগের জাতীয় সহানুভুতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিলেন’।

একবার কোনও একটি পরিস্থিতিতে একজন ইংরেজ সাহেব রায় দিয়েছিলেন যে দুটি বড় মসজিদের সামনে গান-বাজনা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে কিন্তু ছোট ছোট মসজিদের সামনে নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে গান বাজনা চলতে পারে। প্রত্যুত্তরে পীর সাহেব বলেছিলেন যে আল্লাহতালার কাছে বড় মসজিদ আর ছোট মসজিদের পার্থক্য নেই। তাই কোনও মসজিদের সামনেই গান-বজনার অনুমতি থাকা উচিত নয়।

ফুরফুরা শরীফ সম্পর্কে কিছু তথ্য সকলের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। এই তথ্য আমার মনগড়া নয়। প্রত্যেকটি তথ্যের রেফারেন্স আছে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে ফুরফুরা শরীফের দর্শন এবং লক্ষ্য সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার দায়িত্ব পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি। তবে একটা কথা না বললেই নয়। সেটা হল আজকে আব্বাস সিদ্দিকী দলিত-মুসলিম ঐক্যের যে ভেক ধরেছে, সেটা বালিয়াবাসন্তী দখলের সময়ে তারা যে ছল-চাতুড়ির আশ্রয় নিয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি। তাদের ইতিহাস প্রমাণ করে যে তারাই আসলে দলিতদের প্রকৃত দলনকারী। তাই সাধু সাবধান।

অভিজিত কি আবার রাজিয়াকে ফিরে পাবে?

অভিজিত ঘোষ। পূর্ব বর্ধমান জেলার মেমারি থানার অন্তর্ভুক্ত একটি ছোট গ্রামের ছেলে। বয়স ২৬ বছর। ভালোবেসে বিয়ে করে ওই জেলার‌ই মন্তেশ্বরের মেয়ে রাজিয়া খাতুনকে। রাজিয়ার বয়স ২১ বছর। স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে রেজিস্ট্রি হয় ২৯-০৯-২০২০ তারিখে।

২৮-১১-২০২০ তারিখে রাজিয়ার বাবা এবং মা অভিজিতের বাড়িতে আসে এবং তাকে আশ্বস্ত করে যে এই বিয়ে তারা মেনে নিয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা রাজিয়াকে ডাক্তার দেখানোর অছিলায় তারা সাথে নিয়ে যায় নিজেদের বাড়িতে। এর পর থেকে অভিজিতের সাথে রাজিয়ার যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাজিয়ার সাথে দেখা করতে চাইলে রাজিয়ার বাড়ির লোকেরা অভিজিতকে গ্রামে ঢুকতে বাধা দেয় এবং বিভিন্ন ভাবে তার ক্ষতি করার হুমকি দিতে থাকে। মেমারি থানায় অভিযোগ দায়ের করতে অসমর্থ হলে বাধ্য হয়ে পূর্ব বর্ধমান পুলিশ সুপারের কাছে ০৫-০২-২০২১ তারিখে লিখিত অভিযোগ জানায় অভিজিত।

এরপর থেকে আজ পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও রকম সহযোগিতা পায় নি অভিজিত। উল্টে তার কাছে একটি নোটিশ আসে যে রাজিয়া বিবাহ বিচ্ছেদ চায় এবং নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে যদি আদালতে উপস্থিত না হয়, তবে এক তরফা বিচারের মাধ্যমে রায় ঘোষণা করা হবে। ইতিমধ্যে অভিজিতের পিতৃবিয়োগ হয়েছে এবং আদালতে হাজিরার দিনেই ঘাটের কাজ সম্পন্ন হ‌ওয়ার কথা।

এই পরিস্থিতিতে হিন্দু সংহতির সাহায্য প্রার্থনা করে অভিজিত জানিয়েছে যে সে প্রথমে আদালতে হাজিরা দেবে, তারপরে পিতৃশ্রাদ্ধের আবশ্যক কাজ করবে। কারণ সে রাজিয়াকে ফিরে পেতে চায়। হিন্দু সংহতির পক্ষ থেকে কালনা কোর্টে একজন উকিল নিযুক্ত করা হয়েছে অভিজিতের পক্ষে। আগামীকাল শুনানি হতে চলেছে।

আসুন আমরা সবাই মিলে অভিজিত আর রাজিয়ার পাশে দাঁড়াই যাতে এই চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে তারা দুজনে আবার পরস্পরকে ফিরে পায়।

পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র কারা?

হরিয়ানায় বেসরকারি চাকরিতে ভূমিপুত্রদের জন্য ৭৫% সংরক্ষণ হল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রথম সমস্যা হল ভূমিপুত্র কারা সেটা সংজ্ঞায়িত করা।

১৯৪৬ এর নির্বাচনে এই বঙ্গদেশের ৯০% এর বেশি মুসলমান পাকিস্তানের দাবির পক্ষে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিল। ১৯৪৭ এর ২০ শে জুন অখণ্ড বঙ্গের মুসলিম প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন‌ও পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে এবং পাকিস্তানে যুক্ত হ‌ওয়ার বিপক্ষে ভোট দেয় নি। যারা মনেপ্রাণে চেয়েছিল গোটা বাংলাই পাকিস্তানে যুক্ত হোক, কিন্তু সেটা না হ‌ওয়ায় এই নাপাক পশ্চিমবঙ্গেই থেকে গেল, এবং এই মাটির উপরেই জায়গায় জায়গায় মিনি পাকিস্তান গঠনের প্রক্রিয়া চালাতে থাকলো, তাদের কি ভূমিপুত্র বলা যায়?

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অঙ্গরাজ্য। সুতরাং অন্যান্য রাজ্য থেকে যেকোনও লোকের এখানে এসে বসবাস করার, ব্যবসা করার, চাকরি করার, লেখাপড়া করার সাংবিধানিক অধিকার আছে। কিন্তু এই অধিকারের কি কোনও সীমা থাকা উচিত নয়? এই অধিকারের যদি কোনও সীমা না থাকে তাহলে যারা স্বভাবত আগ্রাসী নয়, তাদের অস্তিত্ব থাকবে? তাদের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে? যেখানে সহোদর ভাইদের মধ্যে প্রত্যেকের অধিকার শুধুমাত্র ‘গুড‌উইল’ এর উপরে রক্ষিত হয় না, আইনের উপরে নির্ভর করতে হয়, সেখানে হিন্দু বলেই বাঙ্গালী হিন্দুদের উপরে অবাঙ্গালী হিন্দুর আগ্রাসনের সম্ভাবনা নেই এবং থাকলেও সেটা মেনে নেওয়া উচিত একথা ভাবা কতটা বাস্তব সম্মত হবে? এই দৃষ্টিতে‌ও পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র কারা এবং তাদের অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি সর্বোপরি তাদের অস্তিত্ব কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে সেটা নির্ধারিত হ‌ওয়া উচিত।

এই সমস্ত বিষয়ে বাঙ্গালীকে প্রথমে মুক্তমনা হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ঘরে ফিরলো সামিমা

আমাদের রাজ্যে জনসংখ্যার ভারসাম্য প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলাফল স্বরূপ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র‌ও স্থানান্তরিত হচ্ছে প্রতিদিন। সবাই বলছে খেলা হবে। কিন্তু খেলার রাশ ধীরে ধীরে বাঙ্গালী হিন্দুর হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এটা অনস্বীকার্য।

হিন্দু সংহতি একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবে এই ইস্যুতে আওয়াজ তুলছে, দীর্ঘদিন ধরে বাঙ্গালী হিন্দুদের সতর্ক করে চলেছে। কিন্তু এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি রাজনৈতিক মঞ্চে এখনও গুরুত্বহীন। বিজেপিও এই সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত NRC এবং CAA ইস্যুতে ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ আইন যদিও এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়, তবুও এই আইন আপাতত জনবিস্ফোরণের চেইন রিয়্যাকশনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এই জন্ম নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়েও কার‌ও কোনও উচ্চবাচ্য দেখা যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে এই সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হ‌ওয়ার পাশাপাশি  হিন্দু সংহতি রামায়ণে বর্ণিত কাঠবিড়ালির মত তার সীমিত সামর্থ্য নিয়ে চেষ্টা করে চলেছে এই সমস্যার সমাধানের অন্যতম একটি পথের দিশা দেখাতে। এই পথ ধর্মান্তরকরণ রোধের পথ, এই পথ ঘরে ফেরানোর পথ।

আজ ঘরে ফিরলো সামিমা (নাম পরিবর্তিত)। সে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মেয়ে। কলেজ ছাত্রী। বয়স ২০ বছর। সহপাঠী সমীরের হাত ধরে তার এই সনাতনী সমাজে প্রত্যাবর্তন। একদিকে ‘দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী’-র স্বভাবসিদ্ধ প্রতিক্রিয়া, অপরদিকে তথাকথিত উদার হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল প্রত্যাখ্যান- এর জাঁতাকলে পিষ্ট সমীর সামিমার জুটিকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবে কে? তাদের সামাজিক সম্মানের সাথে সাথে নিরাপত্তা দেবে কে? তাদের আইনী সহায়তা দেবে কে? তাদের পায়ের তলায় মাটি আর মাথার উপরে ছাদের ব্যবস্থা করবে কে?

আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করে চলেছি। আপনারাও করুন। এই কাজে আমাদের সাথে থাকুন।

শুধুমাত্র বাংলাভাষাকে তারা আংশিক ধরে রেখেছে বলেই কি তাদের বাঙ্গালী বলা যায়?

বাঙ্গালী যখন মুসলমান হয় তখন সে তার বাঙ্গালী নাম পরিবর্তন করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পূর্বপুরুষের পদবী (সারনেম) পরিবর্তন করে, পোষাক বিধি (ড্রেসকোড) পরিবর্তন করে। তার পালনীয় উৎসব আলাদা হয়ে যায়, তার উপাস্য আলাদা হয়ে যায়, তার বলায় এবং লেখায় ব্যবহৃত শব্দাবলী অর্থাৎ ভাষা আলাদা হয়ে যায়, পরিজনদের সাথে তার সম্পর্কের নামগুলো আলাদা হয়ে যায়( মা হয় আম্মা, কাকা হয় চাচা ইত্যাদি), তার সমাজ আলাদা হয়ে যায়, সামাজিক মূল্যবোধ আলাদা হয়ে যায়, পাপপুণ্যের বোধ আলাদা হয়ে যায়, তার শত্রু-মিত্রের বোধ আলাদা হয়ে যায় (কাফের-মোমিন), তার হিরো-ভিলেনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হয়ে যায়(বখতিয়ার খিলজি, জাফর খাঁ গাজী, শাহজালালের মত বিদেশী আক্রমণকারীরা তার চোখে হিরো আর লক্ষ্মণ সেন, প্রতাপাদিত্য, রাজা গণেশরা ভিলেন)। তার পূর্বপুরুষরা আত্মীয় থেকে শত্রুতে পরিনত হয়, পূর্বপুরুষের উপাস্য তার কাছে ঘৃণ্য হয়ে যায়। এক কথায় তার সামগ্রিক জীবনদর্শন পরিবর্তিত হয়ে যায়।এইভাবে যারা নিজের পূর্বপুরুষের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, শুধুমাত্র বাংলাভাষাকে তারা আংশিক ধরে রেখেছে বলেই কি তাদের বাঙ্গালী বলা যায়?

মুসলমানরা অংশীদারিত্ব চায় না, ওরা দখল চায়

মুসলমানরা অংশীদারিত্ব চায় না, ওরা দখল চায়। আজকে ব্রিগেডের দখল হচ্ছে আগামীকাল সম্পূর্ণ পশ্চিমবঙ্গের মাটি দখলের মহড়া। তৃণমূল আগেই আত্মসমর্পণ করে দিয়েছে মুসলিম মৌলবাদী শক্তির সামনে। তৃণমূলকে চুষে নিয়ে, ছিবড়ে করে, ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মুসলিম সমাজের একাংশ আজকে পরিবর্তনমুখী। ঠিক যেন সাপের খোলস ত্যাগ করার মত। এদিকে বাম-কংগ্রেস নেতৃত্ব‌ও আজকে বুঝিয়ে দিল যে আব্বাস সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ISF হল তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জাপানি তেল।ববি হাকিম, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীরা তৃণমূলে, মহম্মদ সেলিম, মান্নান সাহেব, আব্বাসরা জোটে এবং কাশেম আলী, বাবু মাস্টার, ইয়াসিন শেখরা বিজেপিতে থেকে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অ্যাজেন্ডা সফল করার কাজ করতে থাকবে। মুসলিম সমাজ প্রতিটি দলে কর্মরত তাদের প্রতিনিধিদের সবদিক দিয়ে সহযোগিতা করে এদের শক্তি ও উচ্চতা বাড়াতে থাকবে। যে দল‌ই ক্ষমতায় আসুক না কেন ওদের কাছে The situation is ‘Head I win, tail you lose’.

ওয়াকফ: দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার (২)

হাদীস ও ইসলামী সংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী ধর্মীয় কাজে চিরস্থায়ীভাবে নিজের মালিকানাধীন সম্পদকে উৎসর্গ করাই হচ্ছে ওয়াকফ। যিনি দাতা তাকে বলা হয় ওয়াকিফ এবং যিনি ওয়াকফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করেন তাকে বলা হয় মোতোয়ালি। প্রথম পর্বে আমি বলেছি যে মুসলিম শাসনকালে প্রচুর সম্পত্তিকে ওয়াকফ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে যে স্বাধীন ভারতে, বিশেষত ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার পরে স্বাধীনতার আগে করা ওয়াকফ সম্পত্তির কোনও বৈধতা থাকা কি উচিত? দেশভাগের পরে অনেক মুসলমান ভারতে তাদের জমি ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গেছে। পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে অনেক হিন্দু পরিবার সেই সমস্ত খালি জমিতে বসতি স্থাপন করেছে, ব্যবসা শুরু করেছে। সেই সময়ে কোনও জমি ওয়াকফ ছিলো, এই কথা বলে সেই সময়কার রেকর্ড দেখিয়ে আজকে যদি কেউ সেই জমির অধিকার দাবি করে, সেই দাবি কি অনৈতিক নয়? ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত ভারতে আলিবর্দী খাঁ-র করে যাওয়া ওয়াকফের কী মূল্য আছে? দেশভাগের ফলে গোটা দেশটার স্ট্যাটাস পরিবর্তন হয়ে গেল অথচ এইভাবে ওয়াকফ করা জমিগুলোর স্ট্যাটাস আজও অপরিবর্তিত থাকবে? সরকার এই জমির ভাড়া দেবে? তাই ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের আগে পশ্চিমবঙ্গের বুকে যত সম্পত্তি ওয়াকফ করা হয়েছে, সেগুলোর ওয়াকফনামা অবৈধ বলে ঘোষণা করা হোক

এখন দেখা যাক আমাদের দেশের ওয়াকফ আইন কী বলছে। এই আইনে রাজ্য সরকারকে নিজের রাজ্যের জন্য ওয়াকফ বোর্ড গঠন করার অধিকার দেওয়া হয়েছে (U/S 13/1 of The Wakf Act, 1995)। এই বোর্ডে কোনও হিন্দু স্থান না পেলেও তারকেশ্বরের হিন্দু মন্দিরের কমিটির মাথায় অনায়াসে একজন মুসলিম বসতে পারেন। ওয়াকফ বোর্ড রাজ্যের সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রক। এই আইন অনুযায়ী রাজ্য সরকার নিযুক্ত একজন সার্ভে কমিশনারের তত্ত্বাবধানে সার্ভের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোকে চিহ্নিত করতে হয়((U/S 4/1 of The Wakf Act, 1995) । কমিশনার তার সার্ভে রিপোর্ট রাজ্য সরকারকে দিলে রাজ্য সরকার সেটা ওয়াকফ বোর্ডের কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং ওয়াকফ বোর্ডকে এই রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্যের ওয়াকফ সম্পত্তির একটা তালিকা তাদের অফিসিয়াল গেজেটে প্রকাশিত করতে হয়। আইন বলছে, যদি এই তালিকা সম্পর্কে কারও কোনও অভিযোগ থাকে তাহলে তাকে ওই তালিকা প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকে এক বছরের মধ্যে ওয়াকফ ট্রাইবুনালের সামনে দাখিল করতে হবে। এই সময়ের পরে আর কোনও আপীল ট্রাইবুনাল গ্রহণ করবে না এবং প্রকাশিত ওয়াকফের তালিকাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কি জানেন যে আপনার জমি ওয়াকফের তালিকাভুক্ত কি না? আপনি কি জানেন এই তালিকা কোথায় প্রকাশিত হয়েছে? আপনি কি জানেন যে ওয়াকফ সম্পর্কিত কোনও অভিযোগের বিচার করার এক্তিয়ার কোনও সিভিল কোর্টের নেই?

ওয়াকফ: দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার (১)

ওয়াকফ আইন অনুযায়ী যে কোনও সম্পত্তির ক্ষেত্রে ওয়াকফ বোর্ড যদি মনে করে যে সেটা ওয়াকফ সম্পত্তি, ওয়াকফ বোর্ড নিজেই তার তদন্ত শুরু করতে পারে, শোকজ নোটিস পাঠাতে পারে এমনকি অর্ডার পাশ করতে পারে। ওয়াকফ বোর্ডের এই আদেশ চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে যদি না সেটা ট্রাইবুনাল কর্তৃক পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ ওয়াকফ বোর্ডকে এক্ষেত্রে সুয়োমোটো পাওয়ার দেওয়া হয়েছে। ওয়াকফ সম্পত্তিতে এনক্রোচমেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা নিজের উদ্যোগে বোর্ড সরাসরি জায়গা খালি করার আদেশ দিতে পারে। অর্থাৎ আগামীকাল সকাল বেলাতেই ইডেন গার্ডেন, ফোর্ট উইলিয়াম কিংবা আকাশবাণীকে জায়গা খালি করে দেওয়ার নির্দেশ পাঠানোর আইনসম্মত অধিকার ওয়াকফ বোর্ডের আছে।

আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক দল মুসলমানদের সামনে নতজানু। ওয়াকফ সম্পত্তি যাতে বেদখল না হয়, তারজন্য সবাই উদ্বিগ্ন। ২০১১ তে ক্ষমতায় আসার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াকফ সম্পত্তি নয়-ছয়ের তদন্তের ভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দিতে চান। বিধানসভা নির্বাচনের আগেই তিনি মুসলমানদের এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে ৩২টি ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে বিশেষ তদন্তের ভার তুলে দিয়েছিলেন সিআইডি-র হাতে। গত ১১ই ফেব্রুয়ারী, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আগে লোকসভায় এই প্রসঙ্গ তোলেন বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার এবং খগেন মুর্মু। তাঁদের প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নকভি বলেন ওয়াকফ সম্পত্তিকে বেআইনী দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে কেন্দ্র সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।মুসলিম সংগঠন এবং নেতারাও ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে মাঝেমাঝেই সুর চড়াচ্ছেন। তারা দাবী করেছেন যে কতকাতায় যে পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি আছে তার ভাড়াই ৮০০ কোটি টাকা। দাবি উঠেছে ‘ওয়াকফ সম্পত্তিতে আমাদের অধিকার’।

ভাবুন তো, হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষা করা কিংবা সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের দেশে কোনও শক্তপোক্ত ব্যবস্থা আছে? কেউ কি ভেবেছে সেকথা? কত দেবোত্তর সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে কেউ কি তার খবর রাখে? আজ সময় এসেছে। দ্বিধাহীন চিত্তে জোর গলায় আওয়াজ তুলতে হবে- পশ্চিমবঙ্গ বাঙ্গালী হিন্দুর হোমল্যান্ড, এর প্রতিটি ধুলিকণার মালিক বাঙ্গালী হিন্দু। দেশভাগের মাধ্যমে আমরা মাটি হারিয়েছি। এখনও আমাদের মাটি কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত চলছে বিভিন্নভাবে। ওয়াকফ বিষয়টি একটি ঘমন্ত দৈত্য। আমরা এবিষয়ে সচেতন না হলে এ মাটির দখল ছাড়তে হবে।    

  আরও পড়ুন: দেশ এবং জাতিকে বাঁচতে হলে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করতে হবে; প্রয়োজনে সংবিধানের ৩০ ধারা বিলোপ করে সবার জন্য সমান শিক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে

ওয়াকফ: দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার (১)

১২০৪ সাল থেকে বঙ্গভূমির উপরে ইসলামের আক্রমণ শুরু হয়। বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপ দখল করেন। সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে তিনি কোচদের হাতে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হন এবং ১২০৬ সালে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু উল্লেখযোগ্য যে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সদ্য অধিকৃত নদীয়ায় বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ তৈরি করেন। যে কোনও মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে মুসলিম শাসকরা অধিকৃত ভূমিতে গুরুত্ব সহকারে মসজিদ, মাদ্রাসা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। শক, হূণ, কুষাণ ইত্যাদি বহিরাগত হানাদারদের আক্রমণের সাথে ইসলামী আক্রমণের এটা অন্যতম মূলগত পার্থক্য। মুসলমানদের আক্রমণের পিছনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের প্রেরণা ছিল না, ছিল ধর্মীয় প্রেরণা। অবশ্য ইসলাম অনুযায়ী সাম্রাজ্য বিস্তার (দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা) এর জন্য বিধর্মীদের সাথে যুদ্ধ (জেহাদ), বিধর্মীদের সম্পদ এবং নারী লুন্ঠন (গনিমতের মাল) এগুলিও ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তাই আমরা সনাতন ধর্মকে যে চোখে দেখি, ইসলামকে সেই চোখে দেখলে হবে না। আমাদের সনাতন ধর্ম‌ও অবশ্যই রাজনীতি বাদ দিয়ে নয়। রামায়ণ, মহাভারত পড়ুন, রাজা হরিশচন্দ্র, রাজা উশীনরের উপাখ্যান পড়ুন, জানতে পারবেন সনাতনী দৃষ্টিতে ক্ষাত্রধর্ম কি। ওদের সাথে আমাদের এই পার্থক্য সাংস্কৃতিক উত্তরণের স্তরের পার্থক্য। চাল, ভাত আর পায়েসের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে, এই পার্থক্য হল সেটাই। তাই ধর্মের প্রসঙ্গ উঠলেই মুড়ি-মুড়কি একদর গোছের ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি না আওড়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

ওয়াকফ: দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার (২)

যাইহোক, মূল আলোচ্য বিষয় জমি দখল। এবং সেটা বিশ্বব্যাপী নিজেদের মতবাদের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য মতবাদের ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। মুসলিম আক্রমণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখবেন যে কোনও এলাকায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা হ‌ওয়ার পরেই সেখানে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, মাজার ইত্যাদির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে এবং এই উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা জমিকে আল্লাহ-র কাছে উৎসর্গ করা হয়েছে, অর্থাৎ সেই জমির মালিক হয়েছেন আল্লাহ স্বয়ং। আল্লাহর মালিকানাধীন এই ধরণের সম্পত্তিকে আউকাফ বা ওয়াকফ সম্পত্তি বলা হয়। মুসলিম শাসনাধীন বঙ্গে শাসকদের এবং সাধারণ মুসলিম সমাজের উদ্যোগে এইভাবে অসংখ্য ওয়াকফ সম্পত্তি তৈরি হয়েছে যেগুলোর বেশিরভাগ‌ই দেশভাগের পরেও ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবেই আছে, অধুনা বাংলাদেশে তো বটেই, এমনকি আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেও।

দেশে এখন ৬ লক্ষের বেশি ওয়াকফ সম্পত্তি, যার ৪৯% আছে কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশে। দেশে প্রতিরক্ষা, রেল মন্ত্রকের পর তৃতীয় বৃহৎ সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফ বোর্ডের হাতে। সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ২০০ টি। যার মাত্র ২৩ হাজারের মতো সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফ বোর্ডের আওতায়। প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার সম্পত্তির কোন হদিস নেই। ২০১০ সালে কলকাতা বাদে গোটা রাজ্যে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে যে সার্ভে করা হয় তাতে দেখা গিয়েছে ১৬,৪৩,৩৬০ একর সম্পত্তি রয়েছে গোটা রাজ্যে।

কলকাতায় ব্রিটিশরা টিপু সুলতানের পরিবারকে নির্বাসিত করেছিল টালিগঞ্জে। সেই টালিগঞ্জের প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের সংলগ্ন সতীশচন্দ্র রায় রোডের ওয়াকফ সম্পত্তির উপরে আজ মার্কেট কমপ্লেস হলেও জমির মালিকানা কার হাতে? প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডেই অবস্থিত দাতাবাবার মাজার। দাতাবাবা মাজার লাগোয়া আরপি কলোনির সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তি। টালিগঞ্জে গলফ-ক্লাবের জমি ওয়াকফের, ক্লাব আজও তার ভাড়া দেয়। কলকাতার (দক্ষিন) যাদবপুরের মতো জায়গার সুলেখা মার্কেট, গড়ফা, পূর্বাচল কিংবা সন্তোষপুরে ব্যাপক সংখ্যক ওয়াকফ সম্পত্তি কিন্তু ওয়াকফ সম্পত্তি। রাজভবন (গভর্নর হাউস), মোহামেডান, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ক্লাবের জায়গাও ওয়াকফের। এমনকি আকাশবাণী ভবন (কলকাতা), ফোর্ট উইলিয়ামস (ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর), ময়দান ও সংলগ্ন এলাকা, ইডেন গার্ডেনস ওয়াকফ সম্পত্তি। সবই ওয়াকফ সম্পত্তি, যার জমির পরিমাণ ২৫৫৫ বিঘা। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সরকার ১৯৯ টাকা ভাড়া দিত। তারপর মোতায়ালি (তদারক কারী) মওলানা আবুল বরকত সাহেব ৯৯ বছর বয়সে মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীকে আর ভাড়া দেয় না রাজ্য সরকার। বাংলা বিহার-ওড়িশার নবাব আলীবর্দি খাঁ তার শাসনকালে এই ২৫৫৫ বিঘা জমি দান করে যান।

লক্ষ্য করুন, মুসলিম শাসনের অবসান হয়েছে, ইংরেজ শাসন শেষ হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে কিন্তু একটা বিশাল পরিমাণ জমির মালিক থেকে গেছেন আল্লাহ। অর্থাৎ এই জমির উপরে মুসলমানদের দখল থেকে গেছে আইনত। মুসলমানরা ইতিমধ্যেই ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর দাবিদার হিসেবে আওয়াজ তোলা শুরু করেছে। দেশভাগের সময় অনেকেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে যাওয়া ওয়াকফের দিকে তাদের নজর আছে।

কিছুদিন আগের ঘটনা। একজন বাংলাদেশী নাগরিক নিজেকে বিখ্যাত পান্ডুয়া মসজিদের মোতোয়ালি হিসেবে দাবি করেন। তিনি পান্ডুয়ায় থেকে মোতোয়ালি হিসেবে কাজ‌ও শুরু করছিলেন। অভিযোগ ওঠায় আদালত তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল মালদা জেলার প্রশাসনকে। যদিও তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কিছুদিন আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি ছেলে আমার সাথে দেখা করে। দেশভাগের সময় স্থানীয় এক মুসলমানের সাথে তারা ‘জমি বিনময়’ করে ভারতে চলে আসে। এখানে সেই মুসলমানের জমিতে একটি ছোট মসজিদ ছিল। বাংলাদেশ থেকে আসা পরধর্মে শ্রদ্ধাশীল হিন্দু পরিবারটি সংস্কারবশতঃ সেই মসজিদটাকে ভেঙে ফেলে নি। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে চলে যাওয়া সেই মুসলিম পরিবারের কোনও এক আত্মীয় স্থানীয় মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে এসে সেই মসজিদ এবং সংলগ্ন জমি ওয়াকফ বলে দাবি করে।

মনে রাখতে হবে যে রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতা অস্থায়ী কিন্তু ওয়াকফের মাধ্যমে জমি দখল আইনত স্থায়ী। পৃথিবীর বুকে প্রতিটি ভূমিখন্ড হল ইউনিক। এর কোনও ডুপ্লিকেট হয় না। এক একটা প্লট এভাবে দখল হ‌ওয়া মানে হল স্বাধীন ভারতে আইনত নিজের পায়ের তলার মাটির উপরে হিন্দুর দখল হারানো।

আরও পড়ুন: দেশ এবং জাতিকে বাঁচতে হলে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করতে হবে; প্রয়োজনে সংবিধানের ৩০ ধারা বিলোপ করে সবার জন্য সমান শিক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে

কুকুর মারলে জরিমানা; গরু মারলে কি?

কেন্দ্র সরকার আইন আনছে কুকুর মারলে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা। স্বাগত জানাই। কিন্তু গরু মারলে? কি বললেন? গরু অনেকের খাদ্য, তাই গরু মারলে জরিমানা করা যাবে না? কুকুর‌ও তো অনেকের খাদ্য। নাগা, কুকি, লুসাই, মার, ব্রু এই ধরণের অনেক কমিউনিটির লোকেই কুকুর খায়। ভোটের নিরিখে কুকুর খাদকদের সংখ্যা নগণ্য বলে এদের খাদ্য নির্বাচনের অধিকার থাকবে না?

আমি কুকুর মারার পক্ষপাতী মোটেই ন‌ই। কিন্তু পশুহত্যাকে কেন্দ্র করে একটা ভন্ডামি চলছে, পক্ষপাতিত্ব চলছে। এটা বন্ধ হ‌ওয়া দরকার। কুকুর মারার প্রতিবাদ করলে আমি পশুপ্রেমী, ডগ লাভার আর গোহত্যার প্রতিবাদ করলে আমি সাম্প্রদায়িক- এই ভন্ডামি চলবে না।

কয়েকটা রাজ্যে গোহত্যা নিরোধক আইন এসেছে। কেন্দ্র সরকার এক‌ই ধাঁচে আইন করে গোহত্যা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করুক।

Cruelty to animals প্রশ্নে আর একটা বিষয় না বললে চলবে না। এই আইনে খাদ্য হিসেবে নির্বাচিত পশুদের হত্যা করার সময়ে তাদের গলা অর্ধেক কেটে ফেলে রাখা অর্থাৎ জবাই (হালাল) করার প্রথার উপরে নিষেধাজ্ঞা আনা উচিত। কারণ এই পদ্ধতি সর্বাধিক নিষ্ঠুর পদ্ধতি। ধর্মের দোহাই দিয়ে এই নিষ্ঠুরতাকে প্রশ্রয় দেওয়াও কি ভন্ডামি নয়?